ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ১৮ জুন ২০২৬, ৪ আষাঢ় ১৪৩৩ আপডেট : ২ ঘন্টা আগে
শিরোনাম

বাতাসে তোমার ঘ্রাণ 

  শাহরিয়ার ইসলাম পল্লব

প্রকাশ : ৩০ নভেম্বর ২০২৫, ১৮:৪২  
আপডেট :
 ৩০ নভেম্বর ২০২৫, ১৮:৫০

বাতাসে তোমার ঘ্রাণ 
ফাইল ছবি

শহরটা সবসময়ই ব্যস্ত। ভরদুপুরেও যেখানে রাস্তায় শব্দ থামে না, সেখানে সন্ধ্যা নামলেই যেন নগরটা নতুন ছন্দে জেগে ওঠে। সেই জেগে ওঠা সন্ধ্যাতেই শুরু হয় রায়হানের গল্প অথবা বলা যায় তার হারিয়ে যাওয়া গল্পের ফিরে আসা।

শরতের বাতাসে ছিল এক ধরনের নির্মলতা, যেন আকাশের বুক থেকে মুছে গেছে সব ধুলো। রায়হান দাঁড়িয়ে ছিল পুরনো সেই রাস্তার মোড়ে যেখানে দুই বছর আগেও দাঁড়াতো সে এবং ঐশী। তখন তারা দু’জনই ভাবত, পৃথিবীর কোনো জোর নেই যা তাদের আলাদা করতে পারে। কিন্তু জীবন কখনও কখনও গল্পের মতো হয় না। ব্যস্ততা, ভুল বোঝাবুঝি আর অদেখা দূরত্ব ধীরে ধীরে তাদের আলাদা নদীর দুই তীরে নিয়ে গিয়েছিল।

কিন্তু সেদিন হঠাৎ করেই বাতাসে ভেসে এলো এক অস্পষ্ট সুগন্ধ। প্রথমে রায়হান ভেবেছিল হয়তো কাছাকাছি কোথাও কোনো দোকানে ফুল রাখা আছে। কিন্তু ঘ্রাণটা যত গভীরে পৌঁছালো, ততই মনে হলো এটা শুধু ফুলের নয়, এটা এক স্মৃতির ঘ্রাণ। সেই পুরনো পরিচিত সুগন্ধ যেটা সে প্রথমবার পেয়েছিল ঐশীর চুলে মুখ রাখার সময়। অদ্ভুত এক কম্পন বয়ে গেল তার শরীরে, যেন সময় তাকে ধরে টেনে নিয়ে যাচ্ছে দুই বছর পেছনে।

ঠিক তখনই আলো ভেদ করে ধীরে ধীরে সামনে এসে দাঁড়াল ঐশী। থমকে গেল রায়হান।

দুই বছর কেটে গেছে, কিন্তু সেই চোখ দুটো? ঠিক আগের মতোই গভীর, আগের মতোই শান্ত। ঐশীর মুখে সেই স্বাভাবিক হাসিটা, যা এক সময় রায়হানের দিনকে সাজিয়ে দিত, রাতকে শান্ত করত।

ঐশী একটু থেমে বলল-

“ঘ্রাণটা চিনতে পেরেছ?”

তার কণ্ঠে ছিল মৃদু হাসি।

রায়হান হালকা শ্বাস নিয়ে বলল - “ঘ্রাণ কখনও বদলায় না। মানুষ বদলায়, সময় বদলায়… কিন্তু কিছু অনুভূতি বদলায় না।”

সেই মুহূর্তে শহরের সব শব্দ থেমে গেছে মনে হলো। বাতাস যেন তাদের দু’জনকে ঘিরে এক অদৃশ্য বৃত্ত তৈরি করেছে। তারা পাশাপাশি হাঁটতে শুরু করলো ধীর পায়ে। কথা খুব বেশি হলো না, কিন্তু নীরবতাই যেন আলাপের চেয়ে বড় হয়ে উঠল।

রাত নামতে শুরু করলে চারপাশের আলো গলতে গলতে ছড়িয়ে পড়ে রাস্তার ওপর। ঐশী বলল-“জানো, আমি বহুবার ভেবেছি তোমাকে এভাবে সামনে পাবো। কিন্তু সাহস পাইনি। যেন ফিরে এলে আবার হারিয়ে যাবে।”

রায়হান উত্তর দিল -“তুমিই তো আছো। হারানো জিনিস তো এমন হাওয়ায় ভেসে আসে না। এটা ফিরে আসা, হারিয়ে যাওয়া নয়।”

ঐশী ধীরে মাথা নিচু করল। “দুই বছর অনেক কিছু বদলে দিয়েছে। কিন্তু একটা জিনিস বদলায়নি তোমার কাছে থাকলে আমার ভয় কমে যায়। তুমি কি মনে করো, আমরা ভুল করেছিলাম?”

রায়হান কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল- “হয়তো ভুল ছিল। আবার হয়তো সময়ের শিখন। কিন্তু সত্যি বললে, আমি কখনও তোমাকে ভুলে যেতে পারিনি। কোথাও না কোথাও যেন তোমার ঘ্রাণ সবসময় মিশে থাকত আমার দিনগুলোতে।”

তারা নদীর ধারের বেঞ্চে গিয়ে বসলো। হালকা আলোয় দু’জনের মুখ পড়ছিল একে অপরের উপর। ঐশী দূরে তাকিয়ে বলল-“অদ্ভুত না? নদী সবসময় বয়ে যায়, কখনও একই থাকে না। অথচ আমরা ভাবি মানুষ থেমে যাবে।”

রায়হান বলল-“মানুষও বদলায়। কিন্তু অনুভূতিগুলো এমন কিছু যা বাতাসেও লুকিয়ে থাকতে জানে। ঠিক তোমার এই ঘ্রাণের মতো।”

ঐশী হেসে বলল-“তুমি এখনও একই কথা বলার ভঙ্গিটা পর্যন্ত। মনে হয় না যে এত বছর চলে গেছে।”

একটু নীরবতা এল। চারপাশে কেবল নদীর শব্দ আর দূরের যানবাহনের গুঞ্জন। তারপর ঐশী শান্ত কণ্ঠে বলল- “রায়হান, যদি আমরা আবার গল্পটা শুরু করতে চাই… তুমি কি থাকবে? এবার কি আমরা দু’জনেই বেশি বুঝতে পারব?”

রায়হান তার দিকে তাকিয়ে বলল -“গল্পটা তো কখনও শেষই হয়নি, ঐশী। শুধু একটু থেমে ছিল। আর আমি, আমি সবসময়ই তোমার অপেক্ষায় ছিলাম।”

ঐশীর চোখে তখন হালকা জল। কিন্তু সেটা দুঃখের নয় ফেরার আলো।

তারা দু’জন উঠে দাঁড়াল। বাতাস আবার বইলো। এবার সেই ঘ্রাণ আরও স্পষ্ট, আরও গভীর যেন নতুন শুরুর প্রতিশ্রুতি।

শহর তখন রাতের আলোয় জেগে উঠছে। আর সেই আলো ভেদ করেই তারা দু’জন এগিয়ে চলছে এক নতুন ভবিষ্যতের দিকে

যেখানে গল্পটা পুনর্জন্ম নেবে,

বাতাসে মিশে থাকবে সেই চিরচেনা ঘ্রাণ,

আর তারা দু’জন

ফিরে পাওয়া ভালোবাসার নতুন অধ্যায়ে।

লেখক: শাহরিয়ার ইসলাম পল্লব, তরুণ সাংবাদিক ও কবি

বাংলাদেশ জার্নাল/এমবিএস

  • সর্বশেষ
  • পঠিত